দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি —ড. আলী রীয়াজ
23 July 2023
বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি খুব খারাপ অবস্থায় আছে বলে মতামত দিয়েছে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ২৮ শতাংশ। ৪৬ শতাংশ মনে করছে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। তবে গবেষণায় অংশ নেয়া কয়েকজন কোনো মন্তব্য করেনি। কিছু ক্ষেত্রে কোনো কথা না বলাটাই অনেক কিছু বলে দেয়। তাদের মতে, নানা ধরনের হুমকি এবং হয়রানির মতো ঘটনাগুলোকে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেগুলো মূলত রাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলো থেকেই আসে।’
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে বাংলাদেশে মানবাধিকার কর্মীদের কাজের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ ও কর্মপরিস্থিতির ওপর গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশের অনুষ্ঠানে গতকাল তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জেডআই খান পান্না, দ্য নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবির, সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইডের (ব্লাস্ট) নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেনসহ অন্য ব্যক্তিরা।
দেশের মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন ৫০ জন কর্মীর অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর চার মাসের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-সিজিএস। গবেষণার মূল দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
গবেষণাপত্রটি উপস্থাপনকালে আলী রীয়াজ বলেন, ‘গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তিনজন গুমের শিকার হয়েছিলেন, ১১ জন আইনি হয়রানি, শারীরিক আক্রমণের শিকার ১২, সাতজন ঘুসের শিকার, ২৭ জন কাজে বাধার মুখোমুখি হয়েছেন। এছাড়া আরো কয়েক ধরনের হয়রানির শিকার হন গবেষণায় অংশ নেয়া ব্যক্তিরা।’
ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, ‘দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ১০ বছর ধরে খারাপের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু এর আগেও সেই অবস্থাটি খুব ভালো ছিল এমন নয়। তবে কয়েকটি বিষয়কে লক্ষ্য করলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই চিত্রটি ভালোভাবে অনুধাবন করা যাবে। প্রথমত, মানবাধিকারের আইনগত কাঠামোর অবস্থার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আইনসহ কিছু বিষয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। দ্বিতীয়ত, আইনগত কাঠামোর পুরো প্রয়োগ হচ্ছে না। তাই বিচারিক হয়রানির মতো ঘটনা ঘটছে। তৃতীয়ত, কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে গিয়েও প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।’
নিউ এজের সম্পাদক নুরুল কবির বলেন, ‘মানবাধিকার অবস্থা নিয়ে যারা কথা বলেন তারা দেশপ্রেমিক না বা তারা দেশের ইমেজ নষ্ট করছে বলে অভিযোগ করা হয়। কিন্তু এটা সত্য না। কারণ আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের করের টাকাই সরকার সেখানে দিয়ে থাকে। মানবাধিকার কমিশনের প্রণীত সব নীতি সরকার অনুমোদন বা প্রয়োগ করতে বাধ্য নয়, এটি একটি সীমাবদ্ধতা।’
তিনি জানান, মানবাধিকারের বিষয়গুলোকে সুরক্ষিত করতে হবে, একে রাজনীতির সঙ্গে জড়ানো যাবে না।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় প্রভাবশালীদের বিপক্ষে কথা বললেই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। আমাদের এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অভিযোগ আছে। আমরা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু মানবাধিকার নিয়ে যে কাজগুলো করি তা সামনে আসে না। যেমন সাংবাদিক নাদিম হত্যার পর পরই আমরা সেখানে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত তদন্তের কথা বলেছি। এছাড়া মানবাধিকারের অবস্থা নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু এর পরও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সরকারেরই অঙ্গ মনে করা হয়।’
অ্যাডভোকেট জেডআই খান পান্না দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘দেশের মানবাধিকার এখন নিলামে উঠেছে। যার টাকা আছে সবকিছুই তার। রাজনীতিবিদের চেয়ে দেশে পুলিশ ও আমলাদের প্রভাবই বেশি।’
News Courtesy: