নেতৃত্ব জন্মগত নয়, অর্জিত: অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে নারী ও তারুণ্যের নবযাত্রা
তোহফাতুর রাব্বি পিয়াল | 28 September 2025
নেতৃত্ব কোনো জন্মগত বা সহজাত গুণ নয়, বরং অভিজ্ঞতা, দায়বদ্ধতা এবং চর্চার মাধ্যমে ললিত একটি দক্ষতা। বাংলাদেশের পরিবর্তিত সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায়, বিশেষত সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে, এই সত্যটি আজ নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। জাতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষনে দাঁড়িয়ে, যেখানে রাজপথ, শিখ্যা-প্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এক নতুন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নৈতিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা।
দশকের পর দশক ধরে এ দেশের নেতৃত্ব রাজনৈতিক পরিবারতন্ত্র, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এবং পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর হাতে কুক্ষিগত ছিল। কিন্তু তারুণ্যের স্পর্ধা আর নারীর সাহসিকতায় ভর করে যে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে, তা এক অমোঘ সত্যকে সামনে এনেছে: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্বের পরিসর থেকে বঞ্চিত মানুষদের ক্ষমতায়িত করার উপর। এই পরিপ্রেক্ষিত আমাদের সেই পথ সন্ধান করতে হবে, যার মাধ্যমে দেশের তরুণ ও নারীদের মধ্যে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটানো সম্ভব। আমরা বিশ্লেষণ করব সেইসব চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা এবং রূপান্তরের গল্প, যা এই অস্থির সময়ের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে।
“নেতৃত্ব জন্মগত নয়, অর্জিত” এই ধারণাটি জোর দেয়, নেতৃত্যগুণ উদ্ভূত হয় বিশেষ কোনো সুযোগ বা ক্ষমতার উত্তরাধিকারের মাধ্যমে নয়, বরং সচেতন প্রচেষ্টা এবং সম্মিলিত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। এর জন্য প্রয়োজন সংগ্রামের সুযোগ, সহমর্মিতা এবং মানবিক বাস্তবতার উপর সংবেদনশীলতা। ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রথম ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানের অগ্রভাগে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারা পর্যন্ত, বাংলাদেশের নারী ও তরুণেরা বারবার তা প্রমাণ করেছেন। তারা জন্মগত নেতা ছিলেন না; তারা নেতা হয়ে উঠেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এবং সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে, যখন অন্যরা নীরব ছিল।
প্রকৃত নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে অংশগ্রহণ, জবাবদিহি ও আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে। এর জন্য যেমন বিনয়ের সাথে শোনার মানসিকতা প্রয়োজন, তেমনি সাহসের সাথে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতাও জরুরি। এই দর্শন সেই প্রচলিত রাজনৈতিক ও পিতৃতান্ত্রিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে, যা ক্ষমতা বা বংশ মর্যাদাকে নেতৃত্বের সমার্থক বলে মনে করে। এর পরিবর্তে, নেতৃত্বকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় ত্যাগ, দৃঢ়তা এবং নৈতিক শক্তি হিসেবে, যে গুণাবলি বাংলাদেশের তরুণ ও নারীরা এই ক্রান্তিকালে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রদর্শন করেছেন।
সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল এক নৈতিক জাগরণ। কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল, যাদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে কিছু দমনমূলক প্রতিষ্ঠান এবং সুবিধাভোগী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী। যখন অভ্যুত্থান শুরু হলো, তখন নৈতিক নেতৃত্বের সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে এগিয়ে এলো তরুণেরা, যেমন ছাত্র, বেকার যুবক এবং সমাজের প্রান্তিক কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থাকে গ্রাস করা ভয় ও দুর্নীতির সংস্কৃতিকে উত্তরাধিকার হিসেবে মেনে নিতে তারা অস্বীকার করেছিল।
একইভাবে নারীরাও প্রতিরোধের বয়ানকে বদলে দিয়ে সামনের সারিতে এসে দাঁড়িয়েছেন। মিছিল সংগঠিত করা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের তথ্য সংগ্রহ করা এবং চরম বিশৃঙ্খলার মুহূর্তে আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসার মাধ্যমে তাঁরা প্রতিটি ক্ষেত্রে সহানুভূতি এবং নৈতিক সাহসের উপর ভিত্তি করে এক নতুন নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁদের এই কর্মকাণ্ড কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশে হয়নি, বরং প্রয়োজন এবং দৃঢ় বিশ্বাস থেকে জন্ম নিয়েছে। এই অভ্যুত্থান দেখিয়ে দিয়েছে যে, নেতৃত্বের স্ফুলিঙ্গ সবখানেই ছড়িয়ে আছে, দরকার শুধু স্বীকৃতি এবং সুযোগ। এই উপলব্ধি দেশের পুরোনো শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ, অন্তর্ভুক্তি এবং রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে এক নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশের নারীরা দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক অসাম্য এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার দ্বিমুখী বোঝা বহন করে চলেছেন। নির্বাচনে ভোটার বা রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসেবে তাদের গুরুত্ব দেওয়া হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে স্বীকৃতি মেলেনি বললেই চলে। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তৃণমূল থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে নেতৃত্বে নারীর সমানাধিকারের দাবি আবার জোরালো হয়েছে।
প্রতিরোধের দিনগুলোতে অনেক নারী, বিশেষ করে শ্রমজীবী ও গ্রামীণ নারীরা, নৈতিকতার বাতিঘর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। আন্দোলনকারীদের আশ্রয় দেওয়া, গুমের শিকার ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করা বা স্থানীয়ভাবে ন্যায়বিচারের জন্য উদ্যোগ নেওয়ার মতো কাজগুলো প্রমাণ করে যে নেতৃত্ব শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখন তাঁদের এই স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকাকে প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগে রূপান্তরিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলে সমান সুযোগ, সামাজিক নেতৃত্বে অংশগ্রহণ এবং জাতীয় সংলাপে তাঁদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া। এর জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যেমন স্থানীয় সরকারে নারীর জন্য কোটা সংরক্ষণ, নারী নেতৃত্বাধীন সামাজিক সংগঠনগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং গণমাধ্যমে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করা। যখন নারী নেতৃত্বকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তখন সমাজ বিভক্ত হয় না, বরং সহানুভূতি, অন্তর্ভুক্তি এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত হয়।
বাংলাদেশের তরুণেরা, যারা একদিন প্রতিবাদের মাধ্যমেই নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারত, তারা আজ এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাদের এখন গঠনমূলক নেতৃত্বের অর্থ কী, তা নির্ধারণ করতে হবে। স্বৈরাচার, দুর্নীতি এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে তাদের অনেকেই জীবন বাজি রেখেছে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর এক ধরনের হতাশা গ্রাস করার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো ভঙ্গুর এবং গঠনমূলক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত।
তারুণ্যের এই প্রতিরোধ শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বে রূপান্তরিত করতে হলে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা, প্রায়োগিক নাগরিক শিক্ষা এবং দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ। এই শিক্ষা তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নীতি বিশ্লেষণ, অহিংস যোগাযোগ, সামাজিক সংগঠন তৈরি এবং ডিজিটাল মাধ্যমে জনমত গঠনের মতো ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা তাদের জটিল প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করবে। ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত, এই তারুণ্যের শক্তিই ছিল জাতির বিবেক। এখন সময় এসেছে এই শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যোগ্য নেতৃত্বের চাহিদা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি এখন অপরিহার্য। “নেতা জন্মায় না, তৈরি হয়” এই ধারণাটি কেবল একটি অনুপ্রেরণামূলক উক্তি নয়; বংশ, অর্থ এবং উত্তরাধিকারের মাধ্যমে শাসিত একটি সমাজে এটি এক বৈপ্লবিক দর্শন। যখন নারী ও তরুণদের মধ্যে নেতৃত্বের চর্চা হয়, তখন তা একটি সম্মিলিত জাতি গঠনের প্রয়াসে পরিণত হয়।
এই নতুন প্রজন্মকে পুরোনো কাঠামোর উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখলে চলবে না, তাদের দেখতে হবে সহানুভূতি, সততা এবং জবাবদিহির উপর ভিত্তি করে এক নতুন আদর্শিক ব্যবস্থার স্থপতি হিসেবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কোনো অভিজাত প্রাসাদে বা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হবে না; সেই নেতৃত্ব গড়ে উঠবে ক্লাসরুমে, সামাজিক সংগঠনে, রাজপথের আন্দোলনে এবং ন্যায়বিচারের জন্য করা প্রতিদিনের সংগ্রামে। প্রতিরোধ থেকে পুনর্গঠনের এই যাত্রায় কেবল স্লোগান যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নেতৃত্বের বিকাশে সচেতন বিনিয়োগ। তবেই বাংলাদেশ অভ্যুত্থান থেকে উত্তরণে, হতাশা থেকে সম্ভাবনায় এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ক্ষমতা থেকে অর্জিত আস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।
নেতার জন্য অপেক্ষা করে নয়, বরং নতুন নেতা তৈরি করার দৃঢ় প্রত্যয়ের মধ্য দিয়েই ঘটবে এই জাতির নবজাগরণ।